অরুণাচল-ভ্রমণ-পর্ব-৪

অরুণাচল প্রদেশ ভ্রমণ – পর্ব – ৪

আমাদের ভ্রমণ পথ – গৌহাটি থেকে ভালুকপং হয়ে দিরাং তারপর তাওয়াং – ফিরতি পথে বমডিলা হয়ে গৌহাটি। সময়কাল – ডিসেম্বর ২০১৮।

আমরা এসে গেছি দিরাং শহরে। এটি ছিল একটি গ্রাম। এখন শহর হয়েছে। উচ্চতা ৫১১৮ ফুট। আমরা ছিলাম একেবারে দিরাং মনাষ্ট্রির মধ্যে। চোখের সামনে দিরাং নদী আর চারিদিকে ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি। দিরাং এ থাকব একদিন, পরের দিনের যাত্রা সেই বরফ ঢাকা সেলা পাস হয়ে তাওয়াং। এখানে আসতেই সন্ধে নেমে গেল। আর পাহাড়ের সন্ধে মানেই শান্ত নিঝুম। আমার একমাত্র সহধর্মীনি এসে বললেন কি খালি লিখে চলেছ, এ ছাইপাঁশ ট্র্যাশ লেখা তোমার পড়বেটা কে শুনি, একটু ছবি-টবি দাও না। তো..কিছু ছবি দিলাম, দেখে নিন (তা বলে ভাববেন না আমি বউকে ভয় পাই)..

Dirang-Monastery

Dirang-Monastery - 2

Dirang-Monastery

অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যটার জন্ম সবে হাল আমলে ১৯৮৭ তে। তার আগে এর কিছু অংশ ছিল অসমে, কিছু তিব্বতের সঙ্গে (চিন তো এখনও দাবি করে তাওয়াং তিব্বতের অংশ), কিছু আবার ভুটানে। কিন্তু এই এলাকার কথা পাবেন মহাভারত ও তখনকার লেখায়। আর লেখা ইতিহাস ঘাঁটলে আপনি দেখতে পাবেন যীশু খ্রীষ্টের জন্মের ৫০০ বছর আগে এখানে রাজত্ব করত মংপা রাজারা। মংপা উপজাতি প্রায় ২৫০০ হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে অরুণাচলে। এখনও ৬০,০০০ এর মত মংপা উপজাতি আছে অরুণাচল প্রদেশে। ৬ নম্বর দলাইলামা মংপা উপজাতি থেকে এসেছেন। মংপারা দিরাং দূর্গ বা ফোর্ট তৈরি করেছিল ১৭ শতাব্দীতে।

আবার সুটিয়া বা ছুটিয়া রাজারা রাজত্ব করেছেন ১১৮৭ থেকে ১৬৭৩ সাল। তাদের রাজত্ব ছড়িয়ে ছিল অসম থেকে অরুণাচল। এরা মূলত অসমের উপজাতি। এখন এদের সংখ্যা ২৬ লক্ষের কাছাকাছি। তারপর যথারীতি ইংরেজের আগমান ও দখল। এখন ভারতের হাতে।

এবং এসে হাজির হল চার বছরের ছোট্টো মেয়ে ‘মিষ্টি কুটুম’। – কি করছ? আমি তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম একা হোটেলের ঘরের সামনে, কনকনে ঠান্ডা, মাথার ওপর নিঝুম ফুটফুটে চাঁদ। ডিসেম্বরে পাহাড়ে এলে খুব যেমন ঠান্ডা থাকে তেমনি ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ পাওয়া যায়। অন্য সময়তো মেঘ আর বৃষ্টি খেলা করে যখন তখন। আজ চাঁদ যেন মায়াবী রুপোর চাদর দিয়ে মুড়ে দিয়েছে দিরাং ভ্যালিকে। ‘মিষ্টি কুটুম’ না এলে বুঝতেই পারতাম না দাঁড়িয়ে আছি কোথায় – স্বপ্নে না বাস্তবে। আমি ঠিক এজন্যই পাহাড়ের ভক্ত। কখন যে কি রূপ নিয়ে আপনার কাছে ধরা দেবে তা আগে থেকে কিচ্ছুটি টের পাবেন না। এই যে আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি আর দেখছি – অনেক কাছে চাঁদটা নেমে এসেছে – রুপোলি-মায়াবী-স্বপ্নালী আলো চরাচর ছেয়ে আছে – পাহাড়ের গায়ে হালকা কুয়াশা যেন রুপোলি-মায়াবী-স্বপ্নালী চাদর জড়িয়ে পাহাড় ঘুমোতে যাবে এইবার। এই দৃশ্য এই মনের অবস্থা আর কখনও হয়তো ফিরে আসবে না। পাহাড় ধরা দেবে অন্য এক রূপে। এই ভালোলাগার ঘোর চিরটা কাল আমার মনের মধ্যে থেকে গেল। আজ লিখতে বসে সিনেমার মত সব দেখতে পাচ্ছি।

‘মিষ্টি কুটুম’ বলল কি করছ? বললাম – চাঁদের সঙ্গে কথা বলছি।

তুমি একটা বোকা, চাঁদ কি কথা বলে?

বলে তো কিন্তু তার জন্যে আলাদা ভাষা আছে। আচ্ছা দেখতো চাঁদে বুড়ি বসে চরকা কাটছে কিনা।

চরকা কি?

যা দিয়ে আগে সুতো বানানো হতো।

কিন্তু কোনো বুড়িকে তো দেখছি না। বল না বুড়ি কথায়?

জানিস তো আমার ঠাকুমা এই গল্পটা করতো আর আমি ঠিক এই প্রশ্নটা করতাম।

দিরাং এর পাহাড় আমাকে মনে পড়িয়ে দিল অনেক দিন আগে চলে যাওয়া এক মানুষকে।

লিখতে লিখতে আমার একমাত্র বউ এসে হাজির – আবার সেই ভুলভাল লিখছো? লোকের খেয়েদেয়ে-হোয়াটসপ-ফেসবুক দেখে কাজ নেই তোমার এই আজেবাজে লেখা পড়বে। দাও কিছু ভালো ছবি দিয়ে দাও।

অতএব এখানেই শেষ করলাম আর কিছু ছবি আপনাদের জন্য রাখলাম (তা বলে ভাববেন না আমি বউকে ভয় পাই)..

Dirang-Monastery

Dirang-Monastery

Dirang-Monastery

Dirang - Arunachal Pradesh

– দেবদুলাল দাস

Debdulal Das

https://www.facebook.com/debdulal.das.351

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সাম্প্রতিক পোস্ট

আমাদের কথা

আমাদের কথা

নতুন যুগের নতুন স্বপ্ন নিয়ে আমাদের পথ চলা শুরু । আমরা যারা স্বপ্ন দেখি সাহিত্য নিয়ে, স্বপ্নকে পরিণত করি সাহিত্যে, আসুন হাতে হাত মিলিয়ে গড়ে তুলি – সাহিত্যের স্বপ্ন স্বপ্নের সাহিত্য ।।

লেখা পাঠান

যারা সাহিত্যের স্বপ্ন নিয়ে নতুন কিছু ভাবতে চান আমাদের কাছে পাঠান – কবিতা, গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, বইয়ের সমালোচনা, নাটক সিনেমা সমালোচনা – ইমেল – unilit17@gmail.com

– দেবদুলাল দাস