অরুণাচল প্রদেশ ভ্রমণ – পর্ব – ৫

অরুণাচল প্রদেশ ভ্রমণ – পর্ব – ৫

আমাদের ভ্রমণ পথ – গৌহাটি থেকে ভালুকপং হয়ে দিরাং তারপর তাওয়াং – ফিরতি পথে বমডিলা হয়ে গৌহাটি। সময়কাল – ডিসেম্বর ২০১৮।

এবার যাবো সেলা পাস হয়ে তাওয়াং। সুন্দরী দিরাংকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে চললাম তাওয়াং এর দিকে। ১২৯ কিলোমিটার, সময় লাগবে কম-বেশি ৬-৭ ঘন্টা। পেরিয়ে যাব সেলা পাস ১৩,৬৮০ ফুট উচ্চতা। আমাদের হিসেব মত এখন সেলা পাস বরফ-সুন্দরী হয়ে থাকবে। বিপদ আছে। গাড়ি হড়কে যেতে পারে, তার চে বড় কথা রাস্তা বন্ধ হয়ে আমরা আটকে যেতে পারি। কিন্ত ঐযে যাদের পায়ের তলায় সর্ষে আর মাথায় চরৈবেতি মন্ত্র, তাদের আটকায় কে। নেতাজী সুভাষকে আটকে রাখা গিয়েছিল? কলকাতা হয়ে আফগানিস্তান হয়ে কোথায় উঠলেন – না জার্মানিতে। সেখান থেকে জাপান হয়ে ভারতে এলেন বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। বিবেকানন্দ সারা ভারত ঘুরে চললেন মাথার মধ্যে চরৈবেতি নিয়ে। তারপর এক্কেবারে আমেরিকা। আমেরিকা জয় করে চললেন ইংল্যান্ড। কলকাতায় এসে তাঁর মিশন বা লক্ষ নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন রামকৃষ্ণ মিশন। বেঁচেছিলেন মাত্র ৩৯ বছর। চে গেভারা – জন্ম ১৯২৮ আর্জেন্টিনায়। কিন্তু সারা দক্ষিন আমেরিকা তাঁর দেশ। তিনি মনে করতেন এগিয়ে চলাই জীবন। যত বাধা আসুক না কেন। তিনি কার্ল মার্কসের ছাত্র, মনে করতেন দেশে দেশে সমাজতন্ত্র হোক, কেউ যেন গরীব না থাকে। তাঁর বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোকে নিয়ে কিউবায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেন। আবার এগিয়ে চললেন বলিভিয়া দেশটিতে সমজতন্ত্র আনার জন্য। সেখানে আমেরিকার ভাড়াটে সৈনিকরা তাঁকে গুলি করে শেষ করে দিল। বয়স কত ছিল? মাত্র ৩৯ বছর। তিনি জানতেন যে কোনো সময় শেষ হয়ে যাবেন, মিলিটারির গুলিই তাঁর শেষ খাবার। তবু এগিয়ে চলাই তাঁর মন্ত্র। আমর যদিও অতি ছোটেখাটো মানুষ তবু এগিয়ে চলতে দোষ কোথায়।

জিতুর ঝাঁকুনিতে আমার চিন্তা ছিঁড়লো – মেসো দেখো সামনে কি দেখা যাচ্ছে। তাকিয়ে দেখি তাইতো দূরে গাছের মাথায় থোকা থোকা বরফ। আমাদের গাড়ি ওপরে উঠছে আর পাল্টে যাচ্ছে প্রকৃতি তার গাছপালা, মাটি, আবহাওয়া। আমরা এবার প্রায় বারো হাজার ফুট উঠে এসেছি। মেঘ এসে রাস্তা ঢেকে দিয়েছে। ড্রাইভার কি করে যে গাড়ি চালাচ্ছে সেই জানে। যত ওপরে ওঠা যায় হেয়ারপিন বেন্ট, উল্টোদিক থেকে মাঝে মাঝে ছুটে আসছে গাড়ি। আমাদের ড্রাইভার কিন্তু ভয়ডর হীন। এই রাস্তা ন্যাশনাল হাইওয়ে। মোটামোটি চওড়া। তাই খাদে পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। আমার প্রথম পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা দার্জিলিং যাওয়ার সময়। গাড়ি এক একটা বাঁক ঘুরছে আর মনে হচ্ছে এই খাদে পড়লাম। প্রথম পাহাড়ে যাওয়ার সঙ্গী হয়েছিল বিস্ময়, আনন্দ আর ভয়।

এবার সত্যি ভয় লাগতে শুরু করল যখন দেখলাম গাড়ির চাকার তলায় কুচো বরফ এসে যাচ্ছে। কারন পাশে পাহাড়ের গায়ে বরফ জমে আছে। গাড়ির গতি কমে আসতে লাগলো। বরফে গাড়ি চালাতে গেলে চাকায় চেন লাগাতে হয় গাড়ি যাতে স্কিড না করে কিন্তু ওসব আর ভাবার সময় নেই – এবার যে দৃশ্য দেখলাম তা আমি আগে কখনও দেখি নি। বাঁদিকে বাঁক ঘুরতেই সেই অসাধারণ দৃশ্য – আমাদের নীচে মেঘ, পশ্চিমদিকে থেকে সূর্য মনের আনন্দে রোদ ছড়িয়ে দিচ্ছে মেঘের ওপর। আমাদের ডানদিকে যে উপত্যকা তাতে মেঘেরা জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে। এতদিন মেঘকে দেখে এসেছি আমাদের মাথার ওপর, দার্জিলিং এ দেখেছি মেঘেরা হঠাৎ ছুটে এসে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু আমাদের পায়ের তলায় মেঘ? তাও আবার রোদের কিরণ ছড়ানো? নাহ্ গাড়ি হড়কে পড়ে গেলেও আর দুঃখের কিছু নেই। অবশ্য সেসব কিছুই হয় নি। উল্টে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে ছিল আরও বড় আনন্দ যার জন্যে ঠান্ডার মধ্যে ঠান্ডা জায়গায় আসা। তার আগে কিছু ছবি দেখে নেওয়া যাক।

Arunachal Pradesh - sela pass
arunachal pradesh - sela pass
Arunachal Pradesh - sela pass - 3
Arunachal Pradesh - sela pass - 4

সেলা মানে হল সে লা – লা মানে পাস। যেমন নাথু লা, খারদুং লা, জোজি লা। আমরা সেলা কে সেলা পাস বানিয়ে নিয়েছি। এর ওপর দিয়ে এন এইচ ১৩ চলে গেছে। তাওয়াং যাওয়ার একমাত্র রাস্তা বলতে পারেন।

সেলা পাসে গাড়ি থেকে নামতে না নামতেই চার বছরের ছোট্টো মেয়ে ‘মিষ্টি কুটুম’ ওয়েলকাম করল একমুঠো বরফ আমার মুখে ছুঁড়ে। আমিও দৌড়লাম তাকে ধরার জন্য। সে তখন দুধ সাদা বরফের ওপর উঠে গেছে। এরকম হাতের মুঠোয় বরফ ঢাকা পাহাড় আমাদের অভিজ্ঞতায় বিরল। এখন আমরা সবাই চার বছরের ছোট্টো বাচ্চা হয়ে গেছি। যেদিকেই তাকাচ্ছি শুধুই বরফ, সেলা লেকও বরফে ঢাকা। আকাশে কিন্তু সূর্য ঝকঝক করে হাসছে। আমাদের বন্ধু রতন আনন্দে বরফের ওপর গড়াগড়ি খেতে লাগলো। আমরা ছবি তুলে চললাম যে যেমন পারলাম। এদিকে মাঝে মাঝে প্রচন্ড হাওয়া, বরফের কুচি এসে চোখে মুখে ঢুকতে লাগলো, কনকনে কারেন্টের শক খাওয়ার মত ঠান্ডা। তাপমাত্রা ৩-৪ এর কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে। তার মধ্যে চলছে আনন্দের দাপাদাপি। ড্রাইভার বলেই চলেছে চলুন চলুন দেরি হয়ে যাবে। কে শোনে কার কথা। তাওয়াং এখনও ৬৭ কিলোমিটার।

ছোটোবেলায় সুইটজারল্যান্ড এর বরফে মোড়া ছবি দেখে ভাবতাম কোনোদিন কি যেতে পারবো এরকম জায়গায়। সেলা পাস আমাদের সেই দুঃখ ভুলিয়ে দিল। পাইন, ফার, দেওদার গাছের গায়ে গায়ে সাদা তুলোর মত জড়িয়ে আছে বরফ। এখনও চোখ বন্ধ করলে সে দৃশ্য দেখতে পাই। সেলা পাস থেকে এবার আমরা নেমে যাব তাওয়াং এর দিকে। ঠিক যেমন ঘুম ষ্টেশন থেকে গড়িয়ে যাই দার্জিলিং এর দিকে। কিছু দূরে এসে সব গাড়ি স্টার্ট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। হলটা কি? নাকি সরু রাস্তায় উল্টো দিক থেকে লরি আসছে, সে ওপরে উঠে গেলে আমাদের যাত্রা শুরু হবে। গাড়ি থেকে নেমে সে কি হিহি কাঁপুনি। কিন্তু সামনে যে অপূর্ব পোস্টকার্ড ছবি তৈরি হয়ে আছে তা না দেখলে জীবনটাই যে বৃথা হয়ে যায় – সামনে বয়ে চলেছে ‘ছু’ এখানের ভাষায় নদী। নদীর ওপারে পাইন গাছ আর তার সারা গায়ে জড়িয়ে আছে তুষার। গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল তবে সে এই তুষার-রূপ দেখে নাকি ঠান্ডায় তা বলতে পারবো না। কি বিশ্বাস হচ্ছে না তো – তা হলে প্রমাণ দিচ্ছি – নীচের ছবি গুলো দেখুন। পরের পর্বে ফিরে আসছি তাওয়াং এর গল্প নিয়ে।

 

Arunachal Pradesh - sela pass - 5Arunachal Pradesh - sela pass - 6Arunachal Pradesh - Sela Pass - 7Arunachal Pradesh - Sela Pass - 8Arunachal Pradesh - Sela Pass - 9Arunachal Pradesh - Sela Pass - 10Arunachal Pradesh - Sela Pass - 11Arunachal Pradesh - Sela Pass - 12Arunachal Pradesh - Sela Pass - 13

– দেবদুলাল দাস

Debdulal Das

https://www.facebook.com/debdulal.das.351

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সাম্প্রতিক পোস্ট

আমাদের কথা

আমাদের কথা

নতুন যুগের নতুন স্বপ্ন নিয়ে আমাদের পথ চলা শুরু । আমরা যারা স্বপ্ন দেখি সাহিত্য নিয়ে, স্বপ্নকে পরিণত করি সাহিত্যে, আসুন হাতে হাত মিলিয়ে গড়ে তুলি – সাহিত্যের স্বপ্ন স্বপ্নের সাহিত্য ।।

লেখা পাঠান

যারা সাহিত্যের স্বপ্ন নিয়ে নতুন কিছু ভাবতে চান আমাদের কাছে পাঠান – কবিতা, গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, বইয়ের সমালোচনা, নাটক সিনেমা সমালোচনা – ইমেল – unilit17@gmail.com

– দেবদুলাল দাস