অরুণাচল-ভ্রমণ-শেষ-পর্ব-৬

অরুণাচল প্রদেশ ভ্রমণ – শেষ পর্ব – ৬

আমাদের ভ্রমণ পথ – গৌহাটি থেকে ভালুকপং হয়ে দিরাং তারপর তাওয়াং – ফিরতি পথে বমডিলা হয়ে গৌহাটি। সময়কাল – ডিসেম্বর ২০১৮।

এবার তাওয়াং। তো তাওয়াং জায়গাটা কেমন। চারদিকে পাহাড় ঘেরা এক শহর। সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট উঁচু। আমরা যখন হাজির হলাম ডিসেম্বর মাসে রাতে তাপমাত্রা নেমে গেল – ৪ ডিগ্রি। আমরা যে হোটেলে ছিলাম তাতে রুম হিটার চলল না। ম্যানেজারের কথা হল এখানে কারেন্টের ভোল্টেজ এত কম যে হিটার চলতে চায় না। শহরের ভোল্টেজ কম নাকি আমাদের হোটেলের কম, শীতের কাঁপুনিতে তা আর জানা হয় নি। তাওয়াং জায়গাটা যদি ম্যাপে দেখেন তাহলে বুঝবেন এর পলিটিক্যাল গুরুত্ব অতি বেশি – তাওয়াং এর পশ্চিমে ভুটান, ঠিক মাথার ওপর চীন যা আগে ছিল তিব্বত।

হোটেলের ছাদে রোদ মেখে হাঁটছিলাম ছুট্টে এসে কোলে উঠল চার বছরের ছোট্টো মেয়ে ‘মিষ্টি কুটুম’। কি করছ?

এই দূরের যে পাহাড়টা তাকে দেখছি আর দেখছি পাহাড়ের ওপর তাওয়াং মনাস্ট্রি।

আজ কথায় যাবো?

আমি বললাম – কথায় না বল কোথায় যাব। যাওয়ার তো কথা ছিল বুমলা পাস, কত উঁচু জানিস প্রায় ১৫,২০০ ফুট। এখান থেকে ৩৭ কিলোমিটার। যেখানে যেতে আবার পারমিশন লাগে। কিন্তু যাওয়া তো হবে না।

কেন যাব না?

বরফ পড়ে রাস্তা যে বন্ধ হয়ে গেছে। ওখানে জানিস তো যুদ্ধ হয়েছিল।

চোখ বড় করে ‘মিষ্টি কুটুম’ বলল কি যুদ্ধ? রাম-রাবণ এর যুদ্ধ।

না রে ভারত-চীন যুদ্ধ, সে অনেক আগের কথা – ১৯৬২। বুমলা পাস দিয়ে চীনের সেনারা ঢুকে পড়েছিল আমাদের ভারতে। এই যে হোটেলে আমরা দাঁড়িয়ে আছি এ সব দখল করে নিয়েছিল চীনেরা।

তারা কি খুব খারাপ লোক?

তখন খারাপ ছিল কিন্ত যুদ্ধ যেই শেষ হল তারা এসব জায়গা আমাদের হাতে দিয়ে চলে গেল – তখন তারা আবার ভালো লোক হয়ে গেল।

আচ্ছা আমাদের লোকেরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে নি?

হু করেছে তো। এই যখন আমরা সেলা পাস পেরিয়ে তাওয়াং আসছিলাম রাস্তায় পড়েছিল না ওয়ার মেমোরিয়াল, জায়গার নাম নুরানাঙ্গ – সেই ১৯৬২ এর যুদ্ধ, চীনের সেনারা তাওয়াং নিয়ে নিয়েছে এগিয়ে আসছে সেলা পাস এর দিকে। সেলা পাস পেরোলেই এগিয়ে আসতে পারবে তেজপুর, গৌহাটি দখল করার জন্যে। কিন্তু তারা আটকে গেল নুরানাঙ্গে – সেখানে জসওয়ান্ত সিং রাওয়াত একা যুদ্ধ করেছিল ৭২ ঘন্টা। ভাবতে পারছিস কি সাহস ছিল সেই সৈনিকের। এখনও এই ওয়ার মেমোরিয়ালে ভোর ৪.৩০ তে চা, সকাল ৯ টায় ব্রেকফাস্ট আর সন্ধে ৭ টায় ডিনার দেওয়া হয়, হ্যাঁ রোজ নিয়ম করে দেওয়া হয়। ভারতীয় সৈন্যরা মনে করে জসওয়ান্ত সিং এর আত্মা এখনও ঘুরে বেড়ায় এখানে।

‘মিষ্টি কুটুম’ সব শুনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন করল – মানুষ যুদ্ধ করে কেন?

সত্যিতো মানুষ এত যুদ্ধ করে চলেছে কেন সেই সভ্যতার শুরু থেকে! এই ছোট্টো মেয়েকে কি করে বোঝাবো যে এর অনেক কারণ আছে – জায়গার দখল, সম্পত্তির, মানুষের শরীরের দখল, রাজনীতি, ক্ষমতার রক্তচোখ আরও অনেক কারণ, কিন্তু আসল কারণ হল আমাদের মন। আমাদের মনের মধ্যে লুকিয়ে আছে হিংসা, ঘৃনা, মারামারি কাটাকাটি করার নেশা। ১৮৫৯ সালে একটা বই লেখা হয়েছিল ‘On the Origin of Species’ লেখক চার্লস ডারউইন, তিনি একটা কথা বলেছিলেন “struggle for existence” লড়াই করেই বেঁচে থাকতে হবে। এটাই জগতের নিয়ম। বাঘ সিংহ – হরিণ মোষ না মারলে বাঁচবে না। আমরা যা খাই – মাছ মাংস, ধান গম – কাউকে না কাউকে শেষ করেই পাচ্ছি। আমরই অবাক লাগলো ভেবে যে প্রকৃতি বা ভগবান আমাদের বেঁচে থাকার মধ্যেই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাটা ঢুকিয়ে দিয়েছেন। বুঝুন কান্ড। তাহলে প্রশ্ন জাগে ভগবান বুদ্ধ, যীশুখ্রীষ্ট, কনফুসিয়াস, শ্রীরামকৃষ্ণদেব, গান্ধীজি বলে গেছেন লড়াই নয় শান্তি, যুদ্ধ নয় সবাইকে ভালোবাসাই ধর্ম – সে সব কি ভুল? তাহলে…?? চির শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানী আইনস্টাইন যুদ্ধকে চিরকালের মত বন্ধ করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন। সেই সময় তিনি শ্রেষ্ঠ মনেবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে  অনুরোধ করেন মতামত জানাতে – মানুষ কোনোদিন কি যুদ্ধ থেকে পুরোপুরি সরে যেতে পারবে? মানুষ যুদ্ধ করে কেন? সিগমুন্ড ফ্রয়েডক তার মতামত জানিয়ে চিঠি লেখেন – না মানুষের মনের মধ্যে যুদ্ধ লুকিয়ে আছে, মানুষ থাকলে যুদ্ধ থাকবেই।

হৈ হৈ করে চলে এল জিতু, সতু, রতন আরও সবাই – আরে চল চল গাড়ি রেডি।

আমি বললাম কোথায়, বুমলা পাস তো যাওয়া যাবে না?

মাধুরী লেক যাব।

বললাম মানে সেন্ঙ্গস্টার লেক যেখান মাধুরী দীক্ষিত নাচ করেছিল ‘কয়লা’ সিনেমা শুট করার জন্যে?

হ্যাঁ ড্রাইভার বলল নিয়ে যাবে।

বললাম অসম্ভব, কত উঁচু জানিস প্রায় ১৫,২০০ ফুট মত। বরফে বরফ হয়ে আছে।

আমার একমাত্র বউ ও একমাত্র ছোটো শালী কষে এক ধমক লাগালেন – তোমার খালি না না স্বভাব, সবাই যখন যাচ্ছে চল তোমার অসুবিধে কোখায়?

অতঃএব, যেতেই হল। আমার ঘাড়ে তো একটা মাত্র মাথা, কি বলুন। কিন্তু না এলে জীবনের সেরা এক অভিজ্ঞতা মিস হয়ে যেত। বরফ-সুন্দরীর আর এক রূপ দেখতে পেতাম না। মাধুরী লেক কিন্তু যেতে পারি নি। তার আগেই মিলিটারিরা আমাদের গাড়ি আটকে দেয়। বরফে রাস্তা যে বন্ধ হয়ে আছে। তার বদলে দেখতে পেলাম পিটি সো লেক – Penga Teng Tso Lake। যার উচ্চতা ও কম নয় প্রায় ১২,০০০ ফুট। তাওয়াং থেকে তা ধরুন ১৭-১৮ কিলোমিটার। মিলিটারিরা অতি যত্নে রাস্তা থেকে বরফ সরিয়ে দিয়ে যাবার পথ করে দিয়েছে। রাস্তার দুপাশে দুধ সাদা বরফ তার ভেতর দিয়ে গাড়ি চলেছে হেলতে দুলতে। এলাম পিটি সো লেকে আর প্রেমে পড়ে গেলাম। এত সুন্দর তার রূপ। বরফ সারা জায়গা অধিকার করে আছে, লেকের মাঝখানে অল্প একটু জল দেখা যাচ্ছে। এ মন মাতানো নেশা ধরানো সৌন্দর্যে আপনার দিক ভুল হবে, সময় থমকে থাকবে। আপনার মনে হবে এখানেই থেকে যাই। ফিরে গিয়ে কাজ নেই। একটু কি বেশি বাড়াবাড়ি বকে ফেললাম? চলুন দেখে নেওয়া যাক এই ভিডিওটাঃ

 

আপনাদের আরো কিছু ছবি দেখানোর লোভ সামলাতে পারছি না

PTso Lake Arunachal Pradesh

PTso Lake Arunachal Pradesh - 2

PTso Lake Arunachal Pradesh - 3

PTso Lake Arunachal Pradesh - 3

PTso Lake Arunachal Pradesh - 4

PTso Lake Arunachal Pradesh - 5

পরের দিন চললাম তাওয়াং এর সবচাইতে বিখ্যাত তাওয়াং মনাস্ট্রি দেখার জন্যে। এই মনাস্ট্রি সম্বন্ধে অনেক কথা শুনেছি। ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বড়, পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয়, লাসার পোটালা প্যালেস এর পরই এর স্থান। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো। ২০১০ সালে এক ভুমিকম্পে এই মানাস্ট্রির ক্ষতি হয়েছিল। এখন যিনি ১৪ তম দলাই লামা (নাম হল – Tenzin Gyatso) ১৯৫৯ সালে ভারতে চলে আসেন বা বলা ভালো চীনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে পালিয়ে আসেন ও তাওয়াং মনাস্ট্রিতে থাকেন।

আমরা যখন মনাস্ট্রির ভেতরে ঢুকছিলাম একেবারে শান্ত পরিবেশ। সুঁচ ফোটানো ঠান্ডা আর নরম সূর্যের আলো মাথায় নিয়ে দেখলাম বৌদ্ধ মূর্তি, মিউজিয়াম, দেখলাম ছোটো লামারা গম শুকিয়ে গুছিয়ে রাখছে। মিউজিয়ামে রাখা জিনিসের কাছে ইতিহাস লেখা আছে। কত সব পুরোনো হাতে লেখা বই এর পাতা, কত রকমের বৌদ্ধ মূর্তি, হাত পাখা, হাতে আঁকা ড্রাগন ইত্যাদি। এখানে সন্ন্যাসী বা মঙ্করা শান্ত হাসিমুখ। মোটামোটি হিন্দি বলতে পারেন। মনাস্ট্রির মধ্যে ২০০ বছরের পুরোনো গন্ধ যেন লুকিয়ে আছে।

এবারে ফেরার পালা। এত দিনের প্ল্যান-পোগ্রাম টিকিট কাটা হোটেল বুক করা গাড়ি ঠিক করা – সব শেষ হতে চলল। আজ যাবো বমডিলা কাল নেমে যাব গৌহাটির পথে। সব জায়গা থেকে ফিরতে হয় – জীবনানন্দ লিখেছিলেন – সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;।

অরুণাচলের বিতর্কিত ইতিহাস নিয়ে একটু আলোচনা করলে কেমন হয়? এত লম্বা জার্নি যখন – ১৯৬২ তে চীনেরা যুদ্ধ করেছিল, তাদের দাবি ছিল তাওয়াং তিব্বতের মধ্যে। চীন এখনও মনে করে তাওয়াং তাদের এলাকা ভারত জোর করে অধিকার করে আছে। ২০১৮ সালে যখন দলাই লামা তাওয়াং আসেন, চীন তীব্র প্রতিবাদ করে। তাদের মতে দলাই লামার অধিকার নেই চীনের এলাকায় প্রবেশ করার। বৃটিশ ইন্ডিয়া ১৯০৯ সালে একটি ভারতের ম্যাপ (https://commons.wikimedia.org/wiki/File:British_Indian_Empire_1909_Imperial_Gazetteer_of_India.jpg) প্রকাশ করে তাতে দেখা যাচ্ছে তাওয়াং ভারতের মধ্যে নেই। আবার দেখুন এই ম্যাপটা ১৮৯২ (https://en.wikipedia.org/wiki/Tibet#/media/File:Qing_china.jpg) তাতে মোটামোটি বোঝা যাচ্ছে যে তাওয়াং এরিয়া ভারতের মধ্যে। তার মানে দাঁড়ালো চীন বা বৃটিশ ভারত কেউই ঠিক জানতো না তিব্বত ও ভারতের বর্ডার লাইনটা ঠিক কোথায়। তারা কেউই এই পাহাড় ঘেরা জঙ্গলে ঢাকা এরিয়াকে পাত্তা দিত না। এক বৃটিশ অফিসার সেলা পাস পেরিয়ে ঢুকে পড়ে তাওয়াং এলাকায়। তাই নিয়ে তিব্বত আবার আপত্তি জানায়। এদিকে তার আগে থেকে তিব্বত অধিকার করে আছে চীন। তিব্বত তা মানতে নারাজ। তো তখন মানে ১৯১৪ এ তিব্বত স্বাধীন দেশ যদিও সামরিক শক্তি খুবই কম। বৃটিশ ইন্ডিয়ার ম্যাকমোহন সাহেব একটি বর্ডার লাইনের প্রস্তাব দেন। তাতে ম্যাকমোহন তাওয়াংকে বৃটিশ ভারতের অংশ দেখান। ১৯১৪ সালে সিমলায় মিটিং এ বসেন চীন তিব্বত ও বৃটিশ ভারতের প্রতিনিধি। তাতে তিব্বত ম্যাকমোহন লাইন মেনে সই করে কিন্তু চীন সই না করে আলোচনা ছেড়ে চলে যায়। তারপর কেটে যায় অনেক বছর – ১৯৩৫ এ বৃটিশ ইন্ডিয়া পাকাপাকি ভাবে তাওয়াং এর দখল নেয়। চীন এদিকে তিব্বত নিজেদের দখলে আনে ১৯৫০ সালে। বড্ড জট পাকানেো ইতিহাসের ধারা। এখন তাওয়াং এর যা চরিত্র – জীবনযাত্রা বা কালচার বলুন পুরোপুরি তিব্বতের মত, আইন শৃঙ্খলা পুলিশ প্রশাসন ভারতের হাতে, চীন মনে করে তিব্বত যখন তার দখলে তাওয়াং ও তাদের দখলে থাকা উচিত। আপনি কি মনে করেন??

আবার আসতে হবে অরুণাচলে। অনেক জায়গা তো দেখাই হলো না। জানা হলো না অরুণাচলের মানুষরা কি ভাবে বাঁচে, কি তাদের প্রধান খাদ্য, গ্রামের জীবনযাত্রা কি ভাবে চলে।

– দেবদুলাল দাস

Debdulal Das

https://www.facebook.com/debdulal.das.351

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সাম্প্রতিক পোস্ট

আমাদের কথা

আমাদের কথা

নতুন যুগের নতুন স্বপ্ন নিয়ে আমাদের পথ চলা শুরু । আমরা যারা স্বপ্ন দেখি সাহিত্য নিয়ে, স্বপ্নকে পরিণত করি সাহিত্যে, আসুন হাতে হাত মিলিয়ে গড়ে তুলি – সাহিত্যের স্বপ্ন স্বপ্নের সাহিত্য ।।

লেখা পাঠান

যারা সাহিত্যের স্বপ্ন নিয়ে নতুন কিছু ভাবতে চান আমাদের কাছে পাঠান – কবিতা, গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, বইয়ের সমালোচনা, নাটক সিনেমা সমালোচনা – ইমেল – unilit17@gmail.com

– দেবদুলাল দাস